গৌড় গোধূলি থ্রিলার উপন্যাস

গৌড় গোধূলি থ্রিলার উপন্যাস

গৌড় গোধূলি : ঐতিহাসিক থ্রিলারের আখ্যান

ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা উপন্যাস লেখার পথপ্রদর্শক সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার চেনা পথেই হেঁটেছেন একবিংশ শতকের ঔপন্যাসিক সৌম্য ভট্টাচার্য্য ( ১৯৬৫, ২৩ ডিসেম্বর )। তিনি গতানুগতিক নাগরিক প্রেমের বিপক্ষে গিয়ে ইতিহাসকে অবলম্বন করে পুনর্নির্মিত করলেন বাংলার মধ্যযুগের গৌড়ের ক্রান্তিকালের সময়টি। ইতিহাসের থ্রিলারের প্লট নির্মাণে সৌম্য ভট্টাচার্য্য বেছে নিলেন নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস'(আদিপর্ব) এবং ঐতিহাসিক গ্রন্থ মিনহাজ-উদ-দীনের ‘তবকৎ-ই-নাসিরি’। ইতিহাসের ঘটনা তিনি উপন্যাসের শৈলীতে সৃজন করলেও তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে—-“ আমি ইতিহাস রচনা করতে চাইনি। চেয়েছিলাম ইতিহাস আশ্রয় করে এক জমজমাট উপন্যাস লিখতে যেখানে নীচতা, ষড়যন্ত্র, মহত্ব, সাহিত্য প্রতিভা, সৃজনশীলতা সব মিলেমিশে এক অস্থির সন্ধিক্ষণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে— অতীত সেখানে বর্তমানের মুখচ্ছবি। “‘গৌড় গোধূলি’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি প্রভাব পড়েছে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাস।  পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর এবং তথাকথিত কলকাতার বুকে মধ্যরাত্রিতে দাপিয়ে বেড়ানো কবিদের কথা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এসেছে। ফলস্বরূপ উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে অতীত এবং বর্তমানের মেলবন্ধন।ইতিহাসকে অবিকৃত রেখে সৌম্য ভট্টাচার্য্য ‘গৌড় গোধূলি’ নির্মাণ করলেন। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে পাঠকের উৎসুক্য বেড়েই চলে রহস্য উন্মোচন করার দিকে। পাঠকবর্গ কখনো কবি জয়দেবের হতাশাগ্রস্থ জীবন নিয়ে অশ্রুসিক্ত হন, অন্যদিকে কবি উমাপতি, ধোয়ী কবি প্রমূখদের চাটুকারিতা, ছলচাতুরি দেখে অশ্রদ্ধায় শঙ্কিত হয়ে পড়েন। লক্ষণ সেন’কে ক্ষমতাচ্যুত করার চক্রান্তের সঙ্গে কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে বিরোধ উপন্যাসটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।ক্ষমতার জন্য রাজঅলিন্দে কবিদের চাটুকার, রাজপ্রশস্তিমূলক রচনা প্রকৃত সাহিত্য রসের ধারা থেকে অনেকটাই সরে গেছে। কবি জয়দেব এবং গোবর্ধন ব্যতিক্রম। ভাগ্যের পরিহাসে গোবর্ধন তুর্কি সেনার হাতে নিহত অন্যদিকে কবি জয়দেব লক্ষণাবতী রাজ্য থেকে প্রত্যাবর্তন করেন নিজ গ্রাম কেন্দুবিল্বে। ধোয়ী কবি জয়দেবকে সহ্য করতে পারতেন না। প্রবল মাৎসর্য এবং তৎসঞ্জাত ক্রোধের কারণে ধোয়ী কবি জয়দেব’কে বিষ প্রয়োগে হত্যার ষড়যন্ত্র করলেন। ধোয়ী নিজ বাসভবনে কবি জয়দেব’কে নিমন্ত্রন করে নিয়ে এসে বিষ প্রয়োগ করলেন ডিমবোকের সহযোগিতায়। রাজসভায় ধোয়ী’কে কেউ যাতে সন্দেহ না করে তার জন্য নিজপক্ষে নিলেন রাজশ্যালক লম্পট, চরিত্রহীন কুমারদত্তকে। কিন্তু জয়দেব এই যাত্রায় বেঁচে গেলেন। লক্ষণাবতী’র পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি লাভের আশায় স্ত্রী পদ্মাবতী এবং শ্যালক যোগেশ্বর কে নিয়ে নিজ বাসভূমে বসবাস করতে লাগলেন। জয়দেবের সঙ্গে ধোয়ী ,উমাপতিধর কবি প্রমুখদের মতবিরোধের দ্বৈরথ মোৎসার্ট ও স্যালিয়েরির প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় ডি এল রায় এবং রবীন্দ্রনাথ এর মধ্যে মতবিরোধ।গৌড়েশ্বর লক্ষণসেনের পতনের কারণ ঐতিহাসিকরা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। পাঠকবর্গ আগে থেকেই সেই ঘটনা অবহিত। লক্ষণসেন ১১৭৯ খ্রিস্টাব্দে ষাট বৎসর বয়সে সিংহাসনে আরোহন করেন। তুর্কি আক্রমণকালে লক্ষণ সেনের বয়স আশি বৎসর অতিক্রান্ত। বৃদ্ধ লক্ষণসেন রাজকার্য পরিচালনা করতে ব্যর্থ। রাজকার্য পরিচালনা করতেন পুত্রদ্বয় বিশ্বরূপ ও কেশব। কিন্তু তারাও অহংকারী এবং দাম্ভিক। প্রজাগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তারা রাখেন না। উত্তরাপথ থেকে ব্রাহ্মণদের নিয়ে এসে ভূমি দান করতেই তারা সদাব্যস্ত। কুমারগ্ৰামে ব্রাহ্মণ অরিদমন মিশ্র’কে ভূমি দান করতে গিয়ে যুবরাজ কেশব সেন কৈবর্তদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। বরেন্দ্রভূমির স্বাধীন কৈবর্তরা যুবরাজ কেশব সেনের সঙ্গে অসমযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। রাজশক্তির কাছে তুরুপের তাস এর মত ভেঙ্গে পড়ল কৈবর্ত বিদ্রোহ। পিছু হটলেও প্রতিশোধস্পৃহা থেকে নতুন করে শক্তি, মনোবল জুগিয়ে নিজেদেরকে স্বাধীন ঘোষণা করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন। রাজশক্তিও দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত। কৈবর্তদের বিদ্রোহ এবং রাজশক্তির ক্ষয় ঔপন্যাসিক সহজ সরলভাবে আখ্যান আকারে তুলে ধরেছেন। প্রজাপীড়নের দৃশ্যে ঔপন্যাসিক সৌম্য ভট্টাচার্য্য যথাযথ। কুমারগ্রাম এর সংগ্রাম বর্ণনায় ঔপন্যাসিক  রাজশক্তির ভয়ঙ্কর রূপটি তুলে ধরেছেন;—-“ কুমারগ্রামের যুদ্ধ জমে উঠেছে। ঝাকে ঝাকে শর রাজপক্ষীয়দের তরফ থেকে বর্ষিত হচ্ছে। গ্রামবাসীরা চুপ করে নেই। তাদের ধানুকীরাও শর সন্ধানে ব্যাপৃত। প্রায় দন্ডকাল এরকম চলল। দেখা গেল রাজলক্ষীয়দের ক্ষতি তেমন হয়নি। … অপরপক্ষে প্রায় শতাধিক কৈবর্ত নারী-পুরুষ হতাহত। খালের ওপারে উন্মুক্ত প্রান্তরে পড়ে আছে তারা। তাদের কাতর আর্তনাদ দ্বিপ্রহরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।. . . উন্মুক্ত প্রান্তরেই জনা পঞ্চাশেক নারীর সতীত্বনাশ হল। কোনো কোনো নারীর উপর চার-পাঁচজন পুরুষ বিহার করতে লাগল।. .  . আগুন সেদিন শুধু কুমারগ্রামেই লাগেনি। লেগেছিল বাংলার সমাজে, সভ্যতায়, জীবনচর্যায়। “রাজশক্তির এই ভূমিদান প্রসঙ্গ নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর এর কথা মনে করিয়ে দেয়।লক্ষণসেনের কবি, সেনাপতি, সভাসদ, বণিক প্রত্যেকেই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সদা প্রস্তুত। সবার মনে বদল চাই ভাবনা।—“বদলে দাও। এই দুর্নীতিগ্রস্ত রাজপাট বদলে দাও। সেন রাজারা দেশের বুকের রক্ত চুষছে। তাদের গৌড়বঙ্গ থেকে সমূলে বিতাড়িত করো। ” গোপন ষড়যন্ত্রে শামিল হলেন চারুদত্ত, বণিক বল্লভানন্দ, গুনবিষ্ণু, কবি উমাপতিধর, কবি ধোয়ী, রাজমহিষী বল্লভা। চারুদত্তের অট্টালিকার অভ্যন্তরীণ গুপ্ত কক্ষ হয়ে উঠল সেন বংশের ধ্বংসের সূতিকাগৃহ। পরামর্শে ঠিক হলো তারা যবনের শরণাপন্ন হবেন। বাংলার ভাগ্যাকাশে অন্ধকার সময়ের প্রারম্ভ শুরু হলো। রাজমহিষী বল্লভা পুত্র কুমার অলিপ্তকে রাজ্যভিষেক করবেন; সেই কারণে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন চক্রায়ুধের দিকে। কুমার অলিপ্তর নাম ইতিহাসে নেই। ঔপন্যাসিকের মানস চরিত্র। হিমোফিলিয়া আক্রান্ত এই দুর্ভাগা রাজকুমার রাশিয়ার রোমানভ বংশের অ্যালিক্সির ছায়ায় নির্মিত। কুমার অলিপ্তর চরিত্রটি উপন্যাসে গৌণ হলেও রাজ সিংহাসনের দাবিদার হওয়ায় যথেষ্ট তাৎপর্যমণ্ডিত।চক্রায়ুধ গুনবিষ্ণুকে পছন্দ করতেন না। কারণ চক্রায়ুধ ও রাজমহিষী বল্লভার প্রণয়ে গুনবিষ্ণু বাধা হয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। গুনবিষ্ণুর চরিত্রটির উপরে রাসপুটিন চরিত্রের প্রভাব রয়েছে। পথের কাঁটা সমূলে উৎপাটন করলেন চক্রায়ুধ। কিন্তু গুনবিষ্ণুর মৃত্যু রহস্যে ঘেরা। চক্রায়ুধ খুন করার অভিসন্ধি করলেও রাত্রির অন্ধকারে খুন হতে হলো ডমবীর প্রেমিক শবরের ধনুকের ফলায়। অথচ এই খুন কে করল তা অধরাই রয়ে গেল চক্রায়ুধের কাছে। রহস্যমৃত্যুর ঘটনা সৃষ্টি করে ঔপন্যাসিক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।ষড়যন্ত্র মোতাবেক লক্ষণসেন’কে বিভ্রান্ত করলেন চক্রায়ুধ, উমাপতিধর। রাজপুত্র কেশব এবং বিশ্বরূপের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে কুটিল ষড়যন্ত্রের জালে নিজেকে সঁপে দিলেন গৌড়েশ্বর লক্ষণসেন। আচার্য হলায়ুধ অপরাগ থাকলেও পুত্র চক্রায়ুধের পরামর্শে সায় দিলেন। হলায়ুধ লক্ষণসেনের ভাগ্য গণনা করলেন। সভাকক্ষে হলায়ুধ জানিয়ে দিলেন—- “ শুক্র সুনীচা্ংশ হইয়া নবাংশচক্রে কন্যারাশিতে থাকিলে রাজযোগ ভঙ্গ হয়। পুনরায়, ওই শুক্র পাপদৃষ্ট হওয়া চাই। তোমার ক্ষেত্রে এই অশুভ যোগ দেখতে আছি। তোমার রাশিচক্রে তৃতীয়ে শনি, চতুর্থে রাহু, দশমে কেতু—এ ভালো লক্ষণ নয়।. . . দেইখ্যা তো বোধ হয় যাবনই জিতব তবে অ্যাক্ষনে আ্যাক্ষনে যদি পলাইয়া যাও তো প্রাণে বাঁচতে পার। লক্ষণসেন পালিয়ে গেলেন নবদ্বীপে। ভাগ্যগণনার দৃশ্য সৌম্য ভট্টাচার্য্য এত বাস্তবসম্মত করে দেখিয়েছেন যে, উপন্যাস পাঠের সময় সেই সময়ের চিত্র গোচরীভূত হয়। লক্ষণ সেন লক্ষণাবতী নগরকে চির বিদায় জানিয়ে সপরিবারে নবদ্বীপে চলে গেলেন। কিন্তু নবদ্বীপ বক্তিয়ার খিলজির অতর্কিত আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল। লক্ষণসেন গুপ্ত কক্ষে ভাগ্যগণনার নিয়তিলিপি পাঠ করছেন। এই অংশটি বাইবেলের দানিয়েলের অনুচ্ছেদে বেলশাজারের পতনের কাহিনী অবলম্বনে লিখিত। কোনোক্রমে বঙ্গদেশে পালিয়ে বাঁচলেন লক্ষণ সেন এবং তার পরিবার। শবরোৎসবে গোটা লক্ষণাবতী যখন মদ,মেয়েমানুষে , রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত সেই সুযোগে অশ্ব ব্যবসায়ী ভেকধারী তুর্কিরা অতর্কিত আক্রমন হানল। ভূলুণ্ঠিত হল নগরীর ঐশ্বর্য, মান সম্মান। বাঙালি জাতির ভাগ্যাকাশে তখন উদিত হল মুসলমান শাসন, অস্তমিত হল হিন্দু শাসন।বিনা যুদ্ধে লক্ষণাবতী বক্তিয়ার খিলজির করতলে। সভা অলংকৃত করেছেন কবি ধোয়ী এবং উমাপতিধর। বল্লভার ভাই কুমারদত্ত সসম্মানে আসীন। ভাগ্যচক্রান্তে চক্রায়ুধ বক্তিয়ার খিলজির চাতুর্য ও শঠতার জালে বন্দি। কাফের বল্লভানন্দ এবং কুমারদত্তকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন বক্তিয়ার খিলজি। অন্যদিকে বহুভোগ্যা রাজমহিষী সুযোগ বুঝে বক্তিয়ার এর শয্যা শায়িনী হয়েছেন। পরিবর্তনকামী চক্রীরা ঘটনার পাকেচক্রে ভাগ্যহত ও লুপ্তগৌরবে পর্যবসিত।রাজপ্রাসাদের বিলাস বৈভবের অলিতে-গলিতে ষড়যন্ত্রের পঙ্কিল রহস্য সদা ধূমায়মান। উপন্যাসের পরোতে পরোতে সাবলীল ভঙ্গিমা, ভাষার ব্যবহারে কথকার বুনট করেছেন রহস্যের জটা। উপন্যাসের শৈলী দিয়ে উদঘাটন করেছেন ইতিহাসের আখ্যান; পুনঃ নির্মাণ করেছেন চির চেনা অচেনা রহস্যকে। গতানুগতিক ছকের বাইরে গিয়ে এই ঘরানার উপন্যাস সত্যিই প্রশংসার দাবীদার রাখে, এখানে ঔপন্যাসিক সৌম্য ভট্টাচার্য্য সার্থক।

 

 

___________________________________

Gaur Godhuli is a historical thriller novel.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!