প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের দেবী গল্প

দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন দেবী গল্প

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১২৭৯-১৩৩৮) কথাকোবিদ। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক হয়েও রবীন্দ্র গোত্রের তিনি শিল্পী নন। নিজগুনে স্বকীয়। ‘দেবী’গল্পে সেই স্বকীয়তা বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটকের ভাব সাদৃশ্য থাকলেও গল্পের ট্রাজেডি বর্ণনায় অনন্য তিনি। ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাস কিভাবে একটি দাম্পত্য জীবনকে এবং একটি সংসারকে তছনছ করে দেয় তার সুন্দর উপস্থাপনা এই গল্পটি। গল্পটি শুরু হয়েছে পৌষ মাসের শীতের এক অন্ধকার রাত্রিতে। ‘অন্ধকার’ সময় এক ব্যঞ্জনা বহন করে এসেছে গল্পটিতে। জমিদার পরিবারটি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। বংশের শেষ প্রদীপটি নিভে যায় অন্ধকার বিশ্বাসের জন্য, বিচ্ছেদ ঘটে দাম্পত্য জীবনে।

বিংশতিবর্ষীয় যুবক শিক্ষিত উমাপ্রসাদ এবং তার ষোড়শী বর্ষীয়া স্ত্রী দয়াময়ীর মধুর দাম্পত্য জীবন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। গল্পটি শুরু হয়েছে দয়াময়ীর দেবীত্বের উত্তরণ দিয়ে আর শেষ হয়েছে দেবীর মৃত্যু দিয়ে। দাম্পত্য জীবনের মধুর মিলনে এসে হাজির হয় চিরবিচ্ছেদ।

কালীকিংকর রায় গ্রামের জমিদার। তিনি শক্তির উপাসক। গ্রাম-গ্রামান্তরে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা তাকে শ্রদ্ধা করেন। তিনি সিদ্ধপরুষ। তার দুই পুত্র তারাপ্রসাদ এবং উমাপ্রসাদ। দুই পুত্রবধূ দয়াময়ী এবং হরসুন্দরী। সুখের সংসার। কিন্তু এই সংসার এই নেমে আসে অন্ধকার। কালীকিংকর রায় স্বপ্নে দেখলেন ছোট পুত্র বধূ আরাধ্য দেবী জগন্ময়ীর কৃপা লাভ করেছেন। আদ্যা শক্তি দেবী ছোট বৌমার মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়েছেন। দয়াময়ী মানবী থেকে হঠাৎ করেই দেবী হয়ে গেলেন। প্রত্যেকদিন দেবীর পুজো হতে থাকলো। কিন্তু দয়াময়ী স্বামীর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলেন। উমাপ্রসাদ এই ব্যাপারটা একদম মেনে নিতে পারেননি। রাত্রিবেলা গোপনে উমাপ্রসাদ স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন। সিদ্ধান্ত হলো ঠিক সাত দিন পর তারা দুজনে দেশান্তরী হবেন। নতুন করে দাম্পত্য জীবন শুরু করবেন। যেখানে তারা দুজন দুজনকে একান্ত ভাবে পাবেন কাছে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস ! বিধাতা অন্য কিছু লিখে রেখেছে ।  সাত দিনের নানা অলৌকিক ঘটনা দয়াময়ীকে নাড়া দিয়ে দেয়। দয়াময়ী নিজেও নিজেকে দেবী ভাবতে শুরু করেন। দেবীর কৃপায় মুমূর্ষ শিশুপ্রাণ পায়, চরণামৃত পান করে মহিলারা সন্তান লাভ করেন। এইসব ঘটনা দয়াময়ীকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। দয়াময়ীর বিশ্বাস অটুট থাকে; তিনি দেবী। পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে যেদিন আসে সেদিন দয়াময়ী উমাপ্রসাদ কে বলেন—-” তুমি আর আমাকে স্ত্রী ভাবে স্পর্ষ করো না। আমি যে দেবী নই, আমি যে তোমার স্ত্রী, তা আর নিশ্চয় করে বলতে পারিনে।”

দয়াময়ী গঙ্গার ঘাটে গিয়েও ফিরে আসলেন। স্বামীকে জানিয়ে দিলেন তিনি যাবেন না। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস তিনি ভাঙতে পারবেন না। উমাপ্রসাদকে মহেশ্বর হিসেবে পুজো নিতে বলেন। সচেতন উমাপ্রসাদ এই পথে পা বাড়ালেন না। উমাপ্রসাদ নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করলেন। দেবী ফিরে আসলেন কালীকিংকরের বাড়িতে। চিরবিচ্ছেদ ঘটে গেল স্বামী-স্ত্রীর।

কিছুদিন পরেই দেবীকে অগ্নি পরীক্ষা দিতে হলো। তারাপ্রসাদ ও হরসুন্দরীর একমাত্র ছেলে খোকা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিছুতেই ভালো হলেন না। জ্বর উত্তরোত্তর বেড়েই চলে। কিন্তু কালীকিংকর এবং দেবীর জন্য বৈদ্য কবিরাজ ওষুধ দিতে নারাজ। তারাপ্রসাদ পিতৃভক্ত। পিতার আদেশ অমান্য করলেন না। ফলস্বরূপ খোকা জীবনসায়াহ্নে উপস্থিত। কালীকিংকরের বংশ প্রদীপ খোকার জন্য অনেক অনুনয় বিনয় করলেন দেবীর কাছে। দেবী প্রথমদিকে আদেশ দিলেন জ্বর ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কোন কাজ না হওয়ার দরুন অশ্রু জলে ঈশ্বরের কাছে কাকুতি মিনতি করলেন। তবু ফল হলো উল্টো। খোকা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। এক লহমায় দেবীর দৈবত্বের প্রতি বিশ্বাস ভেঙে ছারখার হয়ে গেল। দেবী নিজেও আত্মহত্যা করলেন। কালীকিংকর বাবুর অন্ধবিশ্বাসের জন্য ভেঙ্গে গেল এক সুন্দর মধুময় দাম্পত্য জীবন, প্রাণ গেল বংশের একমাত্র প্রদীপ খোকার। যে দয়াময়ীর দেবীত্বের উত্তরণ ঘটে গল্পের শুরুতে শেষে শুরু হয় বিসর্জন এর প্রস্তুতি। অন্ধবিশ্বাস তাদের দাম্পত্য জীবন কেও এক লহমায় শেষ করে দেয়।

Related Posts

One thought on “প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের দেবী গল্প

  1. দারুন ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেক উপকৃত হলাম। আশা করছি সকলেই উপকৃত হবে। অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!