সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী উপন্যাস

জাগরী উপন্যাসে বিহারের লোকসংস্কৃতি

 

‘জাগরী’ (১৯৪৫) উপন্যাসটি একটি রাজনৈতিক (Political Novel) প্রধান উপন্যাস। ৪২ আগস্ট আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা একটি পারিবারিক জীবনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের টানাপোড়েন। বাবা-মা বিলু ও নীলু——-এই চারজনের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন মত ও পথের পর্যালোচনা এগিয়েছে। লেখক সতীনাথ ভাদুড়ী রাজনৈতিক ক্ষেত্রটিকে মুখ্য হিসেবে উপন্যাসে নিয়েছেন তা সঠিক; কিন্তু স্বল্প পরিসরে হলেও যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই বিহারের লোকবিশ্বাস সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায়—–কামাক্ষা থনের বিরাট বটগাছের নিচে বিলু, নীলুদের থাকতে হয়েছিল বকড়ীকোলে মিটিং করে ফিরবার সময়। বিহারের মানুষরা বিশ্বাস করেন——“এখানকার মাটিতে শুইয়া থাকিলে নাকি কুষ্ঠ রোগ সারিয়ে যায়।”

তাই দূর-দূরান্ত থেকে লোকেরা এখানে আসেন। বট গাছের নিচে শুয়ে থাকেন রোগ নিরাময়ের জন্য।

জাগরী উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমরা দেখতে পাই পূর্ণেশ্বরী মায়ের কথা এসেছে বারবার। পূর্ণেশ্বরী দেবীর অসীম ক্ষমতা—এমন লোকবিশ্বাস সমাজে প্রচলিত। অসীম ক্ষমতার বলে নিঃসন্তান মায়ের সন্তান লাভ করেন। এই লোকবিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে বিলুর মা মানত করে সন্তান হওয়ার জন্য। এরপর দেখা যায় হয়তো বা স্বাভাবিক নিয়মেই বিলু হলেও বিলুর মায়ের মধ্যে পূর্ণেশ্বরী মায়ের অসীম ক্ষমতা দৃঢ় ভাবে মনে গেঁথে যায়। এই দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই বিলুর মা তার নাম রেখেছিল পূর্ণ। শুধু বিলুর ক্ষেত্রেই নয়—-

“নীলুর হাতে বাঁধা ছিল মা পূর্ণেশ্বরীর মাদুলি, একটা রুদ্রাক্ষ, আর চাকা করে কাটা এক টুকরো হরতকি। সুতোটা ছিঁড়ে গিয়েছে। ওরা জানতো মাদুলি হাতে বাঁধা না থাকলে আর এক পাও চলতে নেই, চললেই নীলুর অমঙ্গল হবে।”

এরপর নীলুর মাধুলি আবার হাতে বাঁধা হলো।

বিলুর দেবভক্তি ও কীর্তনে শখ ছিলনা। যে বিলু লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা আঁকিয়ে নিত লাটিম ও মার্বেলের উপর তার এমন দশায় শঙ্কিত মা। তাই বিলুর মা ———“লুকিয়ে বিলুর খাওয়ার জলের সঙ্গে পূর্ণেশ্বরীীর খাড়াধোয়া জল আর চরণামৃত  মিশিয়ে”

দিয়েছে, আর বলেছেন—–

“মা পূর্ণেশ্বরী আমার ছেলের দোষ নিও না।”

দেবী যাতে বিলুর অমঙ্গল ডেকে না আনেন এবং তার ওপরে ত্রাতারূপে দেবী আসেন এমনই কামনা করেছেন নীলুর মা।

বরহমথান গাছে কোন ব্যক্তির নাম করে ইট বেঁধে দিলে সেই ব্যক্তি দীর্ঘজীবন সুস্থ জীবন লাভ করেন। এই নিয়ম গ্রামের সবাই করে। বিলুর নামে ইট বেঁধে দিয়েছেন বিলুর মা।

দহিভাত গ্রামের গ্রাম্য দেবতা ডিহওয়ার অর্থাৎ সীমানা পাহারা দেয় এমন দেবতাকে বিহারের পূর্ণিয়া মানুষেরা বিশ্বাস করেন। সেখানে গ্রামবাসীরা সকলে মাটির ঘোড়া তৈরি করে পুজো দেন। কলেরা, অনাবৃষ্টির সময়ে মানুষের ত্রাতা হয়ে ওঠেন। লোকোকাহিনী মতে–” ঘোড়ায় চড়ে ষাট হাত লম্বা ডিহওয়ার ঠাকুর গ্রাম পাহারা দেন। ”

গ্রামের মধ্যে শুধু মঙ্গলকারী দেবদেবী থাকেন না; গ্রামের ছেলেবুড়ো সবার মধ্যেই বক রাক্ষসের এক ভয়ঙ্কর ভৌতিক কাহিনী প্রচলিত আছে। বক রাক্ষস কেবল ছেলের মাংস খায়। বক রাক্ষস প্রত্যেক বাড়ি থেকে একটা করে ছেলে ধরেন।

ডাইনি অপবাদ দেওয়া গ্রামের অশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর রীতি প্রচলিত ছিল। যে কাউকে ডাইনি তকমা লাগিয়ে ভিটেছাড়া করা যায় এবং মানুষকে বিশ্বাসের জায়গায় পৌঁছে দেওয়া যায় তার প্রমাণ দহি ভাতের প্রৌঢ়া স্ত্রীকে ডাইনি তকমা লাগানো। কপিলদেও পঞ্চায়েতি করে দহিভাতের প্রৌঢ়া স্ত্রীকে ডাইনি অপবাদ দেয়। সে নাকি গোরেলালের ছেলেকে বাণ মেরে শেষ করেছেন। বুড়িকে গ্রামছাড়া করবার জন্য রাধো, শনিচোরা, ছেদী বুড়ির বাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দেন। তবু বুড়ি ভিটে ছাড়েন নি।

পূর্ণিয়া জেলার বামুনে বিশ্বাস করত: কারোর নামে ভগবানের কাছে নালিশ করলে ভগবান তার কথা শোনেন। এক বামুনের এক ঘোড়া ছিল। বামুনের প্রতিবেশী ছিল এক ধোপা। বামন পূজা করতে বসতেন অমনি ধোপার গাধা বিকট চিৎকার আরম্ভ করত। বামুন ঠাকুর তাই রেগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেন গাধাটা যাতে মরে যায়। দিন কয়েক পর বামুন ঠাকুরের ঘোড়াটা অসুখ হয়ে মরে গেল। বামুন ঠাকুর ভগবানকে বললেন—–” ভগবান, এতদিন ধরে ভগবান গিরি করলে, কিন্তু এখনো কোনটা ঘোড়া, কোনটা গাধা চেনো না।”

রামায়ণ পাঠ করার সময় বিহারীদের লোক ঐতিহ্য ধরা পড়ে। যা বাঙ্গালীদের থেকে ভিন্ন। কেউ একজন রামায়ণ পাঠ করলে বাকি জন একসঙ্গে সুর মেলায়। কিন্তু বাঙ্গালীদের মধ্যে দেখা যায় একজন রামায়ণ-মহাভারত পড়লে বাকিরা সকলে বসে শোনেন।

প্রত্যেক সমাজে নিম্নবর্গের মানুষের জায়গা গ্রামের বাইরে থাকে। জাতপাতের দোহাই দিয়ে কিছু মানুষ সমাজ থেকে ব্রাত্য হয়ে পড়েন। জাতপাতের ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যে একটা সামাজিক বিশ্বাস জন্মেছে মানুষের মধ্যে। যার উত্তরণ বিহারের গ্রামগুলি আজ পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি। গ্রামের ভিতরে থাকবার প্রথা নেই সেজন্য তাদের বাইরে থাকতে হয় মুচিদের। আর সেই পাড়ার নাম হয় বাহরগামিয়া।

বিয়ের গান পৃথিবীর বহু দেশে প্রচলিত। গানের এই ধারাটি বেশ পুরনো। বিয়ে কে উপলক্ষ করে গানের মধ্য দিয়ে মানুষেরা মনের সহজ-সরল অভিব্যক্তি ঘটান। বিয়ের গান গুলিতে সেই সমাজের লোক বিশ্বাস লোকগীতি ধরা পড়ে। বিহারের বিয়েতে দেখা যায় একদল পাত্রপক্ষ ও অপরপক্ষ কন্যাপক্ষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে গানের লড়াইএ মেতে ওঠেন। গানের মধ্য দিয়েই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে। এই চিত্রটি দেখা যায় বিলু ও নীলুর বিস্কুটের টিন নিয়ে বাজানোর মধ্য দিয়ে। বিলু বরপক্ষ এবং নিল হয়েছে কন্যাপক্ষ। বিলু গান করছে—” কপিল থেকে পাঁচ বিয়া, ছোটমা চুমৌনা। ”

আর উঠানের অন্য কোন থেকে নিলু পাল্টা জবাব দিচ্ছেন—” বাজাতে যাও ঠাঁই ধাই কপিল দেওকে বহুকে ছঠমা সাঁই। ”

 

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর দাইমাদের নির্দেশ বিভিন্ন নিয়ম কানুন মানতে হয় সদ্য প্রসব করা মাকে। বিহার বাসীদের মধ্যে রীতির প্রচলন রয়েছে। বিলুর মাকে 24 ঘন্টা শাসন করা বিভিন্ন নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই চিত্রটি ফুটে ওঠে।

বিহারের মানুষেরা অড়হড়ের ডাল ছাড়া আর অন্য কোন ডাল ভালোবাসে না। মুসুরির ডাল খায় কেবল যখন ছেলেপেলে হওয়ার পর মায়েরা আতুর ঘরে থাকে তখন। বিহারীরা ডাটা খেতে পারে না। মিষ্টি ঠিকমতো তৈরি করতে পারে না। তবে মিষ্টির মধ্যে পুয়া তৈরি করতে পারতেন।

প্রত্যেক জাতির ছেলেমেয়েদের খেলায় আছে ছড়া এবং গান। এই ছড়া ও গানের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে সেই সমাজ জীবনের ছেলেবেলার স্মৃতি মধুর সময় । বিহারের ছেলেমেয়েরাও এক ধরনের কানামাছির মত খেলা খেলেন। সরস্বতী ও রান্নাঘরের বারাণ্দায় বাস ধরে ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে একটি ছড়া আওড়ান।

” সরসোয়াতী কি ইস্কুল

ভেরি ব্যাড ভেরি ব্যাড টিচার কুল ”

বিলু সেখানে উপস্থিত হলে পাল্টা আবার বলে—

ম্যাও ম্যাও ম্যাও কু;

বিল্লি ভাইয়া থ্যাংকু। ”

এরপর বিলু ও সরস্বতী এক সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলে

” মুরগি ভাইয়া কি ঠ্যাং খাও? ”

সতীনাথের পূর্বপুরুষেরা নদিয়ার কৃষ্ণনগরে বসবাস করলেও সতীনাথের পিতা ইন্দুভূষণ ওকালতি করতে আসেন পূর্ণিয়া শহরে। সতীনাথ ভাদুড়ী (জন্ম ১৯০৬,২৭ সেপ্টেম্বর-মৃত্যু ১৯৬৫) আজীবন এই পূর্ণিয়াতে থেকেছেন। বড় হয়েছেন, দেখেছেন বিহারের সমাজ জীবন । তাই রাজনৈতিক উপন্যাস লিখলেও ভিড় করেছে– পূর্ণিয়ার লোকজীবন সংস্কৃতি ।এই প্রসঙ্গে বলা যায়——

“জ্ঞান লাভের পর থেকেই মানব গোষ্ঠীভুক্ত শিশু নিজস্ব গোষ্ঠী জীবনের যেসব রীতিনীতি, আচার-আচরণ ,সংস্কার প্রভৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং প্রতিনিয়ত তার চেতনা তথা মানসিকতা সেই বাতাবরণে গড়ে উঠতে থাকে, পরিনামে সেই সংস্কৃতিই তার মজ্জাগত ও স্বভাবজ হয়ে দাঁড়ায়, স্বাভাবিকভাবেই সেই শিশু যখন পরবর্তীতে কবি বা সাহিত্যিক হিসেবে লেখনি ধরেন, তখন কাহিনীর প্রতি তার যত নিরাসক্ত আনুগত্যই থাক না কেন, তার অবচেতনায় মুদ্রিত রীতিনীতি, আচার সংস্কার, বিশ্বাসগুলি তার সৃষ্ট সাহিত্যের ভাজে ভাজে তার নিজের অগোচরেই মুদ্রিত হয়ে যায়।

(মনসামঙ্গল কাব্য জীবনদৃষ্টির বিচিত্র দর্পণে ড:আদিত্যকুমার লালা)

 

 

 

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!